মো: হাসান আলী রেজা (দোজা)
বাংলাদেশ আজ এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতায় উপনীত হয়েছে, যেখানে নির্বাচন আর নিয়মিত সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়-এটি রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা, গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এবং জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক পুনর্নির্মাণের প্রশ্ন। দীর্ঘদিনের অনাস্থা, অংশগ্রহণহীনতা ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের প্রেক্ষাপটে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন তাই কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের আয়োজন নয়; এটি একটি রাষ্ট্রীয় পরীক্ষার নাম।
এই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য না হলে তার অভিঘাত পড়বে সর্বত্র-রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং সর্বোপরি নাগরিক আস্থার ওপর।
নির্বাচন অনিবার্য, বিলম্ব নয়
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের বৈধতার একমাত্র উৎস জনগণের ভোট। কিন্তু সেই ভোটাধিকার যখন কার্যত সংকুচিত হয়, তখন রাষ্ট্র নিজেই প্রতিনিধিত্বহীন হয়ে পড়ে। বিগত সময়ের নির্বাচনী অভিজ্ঞতা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এবং গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে ঠেলে দিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে আসন্ন সংসদ নির্বাচন কোনো রাজনৈতিক দলের দাবি নয়-এটি রাষ্ট্রের অপরিহার্য প্রয়োজন। নির্বাচন বিলম্বিত করা বা প্রশ্নবিদ্ধভাবে আয়োজন করা মানে সংকটকে আরও গভীর করা। নির্বাচনই এখন একমাত্র পথ, যার মাধ্যমে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা সম্ভব।
জুলাই বিপ্লব এর আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন
জুলাই বিপ্লব ছিল ক্ষমতার অলিন্দে নয়, রাজপথে উচ্চারিত এক গভীর গণবাণী। এটি স্পষ্ট করে দিয়েছিল-নাগরিক আর অনির্বাচিত কর্তৃত্ব মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। এই বিপ্লবের মূল সুর ছিল ভোটাধিকার, জবাবদিহি এবং মর্যাদার প্রশ্নে আপসহীনতা।
আসন্ন নির্বাচনকে অবশ্যই এই আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। অবাধ প্রতিযোগিতা, সমান সুযোগ এবং ভয়ের বাইরে থেকে ভোটাধিকার প্রয়োগের নিশ্চয়তা ছাড়া কোনো নির্বাচনই জুলাই বিপ্লবের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না।
প্রতিবেশী রাষ্ট্র ও পররাষ্ট্রনীতি:আত্মমর্যাদার ভারসাম্য
বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান তাকে প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে বাস্তববাদী ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে বাধ্য করে। তবে এই সম্পর্ক হতে হবে রাষ্ট্রীয় স্বার্থভিত্তিক-ক্ষমতাকেন্দ্রিক নয়। অতীতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বৈধতা দুর্বল হলে পররাষ্ট্রনীতিও দুর্বল হয়।
একটি অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারই কেবল প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আত্মমর্যাদাশীল অবস্থান নিতে পারে-যেখানে সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু নতজানুতা নয়; মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু বৈরিতা নয়।
আগামীর রাষ্ট্রব্যবস্থা: প্রতিষ্ঠানই মুখ্য
বাংলাদেশের বর্তমান সংকট ব্যক্তি বা দলের নয়-এটি রাষ্ট্রব্যবস্থার সংকট। নির্বাহী কর্তৃত্বের আধিপত্য, দুর্বল সংসদ, প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন ব্যবস্থা এবং সীমিত মতপ্রকাশ রাষ্ট্রকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
আগামীর রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠতে হবে শক্তিশালী ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর-কার্যকর সংসদ, স্বাধীন বিচার বিভাগ, নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন এবং ভয়মুক্ত গণমাধ্যম। রাষ্ট্র চলবে আইনে, ব্যক্তির ইচ্ছায় নয়-এই নীতিই হতে হবে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের ভিত্তি।
পরিসংহারে, আসন্ন সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য বিরাট পরিবর্তনের সুযোগ। এই সুযোগকে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার কৌশলে পরিণত করা হলে রাষ্ট্রের সংকট আরও গভীর হবে। আর যদি এই নির্বাচন সত্যিকার অর্থে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করে, তবে সেটিই হবে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রথম ধাপ।
ইতিহাস আবার প্রশ্ন করছে-বাংলাদেশ কি গণতন্ত্রের পথে ফিরবে, নাকি সংকটকেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে?
এই প্রশ্নের উত্তর দেবে আসন্ন সংসদ নির্বাচন।
লেখক : গণমাধ্যম ও মানবাধিকার কর্মী।



















