
৪ জানুয়ারি বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা নিজেই নিজেকে উন্মোচন করেছে। একদিনে, এক রাষ্ট্র থেকে তিনটি পরস্পরবিরোধী অবস্থান-এটি কেবল সমন্বয়হীনতা নয়, এটি রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক দেউলিয়াত্বের প্রকাশ।
এক. ভোরবেলায় ঘন কুয়াশায় ঢাকা বিমানবন্দরে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইট নামতে না পেরে যখন আকাশে ঘুরছিল, তখন কয়েকশ যাত্রীর জীবন ছিল অনিশ্চিত। সেই সংকটময় মুহূর্তে ভারতের এয়ার ট্রাফিক সিস্টেমে সহায়তা চাওয়া হলে তারা কোনো নাটক না করে, কোনো শর্ত না জুড়ে, তাৎক্ষণিকভাবে কলকাতায় নিরাপদ অবতরণের অনুমতি দেয়। বাস্তবতা হলো-এই সহযোগিতা না পেলে কী ঘটতে পারত, তা রাষ্ট্রের কেউ প্রকাশ্যে বলতে সাহস করে না।
দুই. উপদেষ্টা আসিফ নজরুল মোস্তাফিজ ইস্যুকে সামনে রেখে ঘোষণা দেন- ভারতে বাংলাদেশ টিম পাঠানো হবে না, ভারতকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে। প্রশ্ন হলো, সকালে যার এয়ার সিস্টেমে জীবন বাঁচলো, বিকেলে তাকেই কাঠগড়ায় তোলা- এটি কি নীতি, নাকি সুবিধাভিত্তিক রাজনীতি?
তিন. খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার আবার ভিন্ন সুরে কথা বলেন। তিনি একই মোস্তাফিজ ইস্যুকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি বাণিজ্যের বাস্তবতা তুলে ধরে ভারত থেকে চাল আমদানির প্রস্তাব দেন। অর্থাৎ রাষ্ট্র নিজেই স্বীকার করছে-ভারত ছাড়া চলবে না।
তাহলে জনতার সামনে দাঁড়িয়ে এই দ্বিমুখী নাটক কেন?
ক্রিকেটে এই দ্বিচারিতা আরও নগ্ন। বলা হচ্ছে-ক্রিকেট রাজনীতিমুক্ত। অথচ সেই রাজনীতির বলি হয়েছেন সাকিব আল হাসান। তিনি শুধু একজন খেলোয়াড় নন-তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেটের পরিচয়, ব্র্যান্ড ও ইতিহাস। আজও প্রশ্নের উত্তর মেলেনি-রাজনীতি ছাড়া তার অপরাধ কী?
পারফরম্যান্স? শৃঙ্খলা? নাকি শুধু তিনি রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর?
যদি ক্রিকেট রাজনীতিমুক্ত হয়, তবে সাকিবকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিক কেন দেখাচ্ছে? কোনো স্বচ্ছ তদন্ত নেই, কোনো স্পষ্ট ক্রিকেটীয় ব্যাখ্যা নেই। আছে শুধু নীরবতা ও ইঙ্গিত- যা সবচেয়ে বিপজ্জনক রাষ্ট্রীয় অস্ত্র।
ভারতবিরোধী স্লোগান এই নাটকের আরেক অধ্যায়। প্রয়োজন হলে ভারত শত্রু, প্রয়োজন ফুরোলে ভারত বন্ধু। আকাশপথে নিরাপত্তা চাই, খাদ্যে চাল চাই, বাণিজ্যে সুবিধা চাই-কিন্তু মঞ্চে উঠে ভারতবিরোধিতা করতে হবে। এটি কোনো আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রের আচরণ নয়; এটি সুবিধাবাদী রাজনীতির কৌশল।
হ্যাঁ, মোস্তাফিজ ইস্যুতে ভারত আরও উদার হতে পারতো।
কিন্তু প্রশ্ন হলো-আমরা কি নিজের অবস্থান নিয়ে সৎ? আমরা কি স্পষ্ট করে বলতে পারি-ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক শত্রুতা না সহযোগিতা?
রাষ্ট্র যদি প্রতিদিন অবস্থান বদলায়, তাহলে জনগণ কাকে বিশ্বাস করবে?
একদিন কাঠগড়া, পরদিন করিডোর-এই নীতিতে কোনো রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।
আজ বাংলাদেশ একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি-রাষ্ট্র এখন আর নীতিতে চলছে না, চলছে পরিস্থিতি অনুযায়ী স্লোগানে। আর স্লোগান দিয়ে রাষ্ট্র চলে না, রাষ্ট্র চলে সিদ্ধান্ত, স্বচ্ছতা ও ধারাবাহিকতায়।
এই দ্বিচারিতা বন্ধ না হলে ক্ষতি হবে শুধু ক্রিকেটের নয়, কূটনীতির নয়-ক্ষতি হবে রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতার। আর বিশ্বাসযোগ্যতা হারানো রাষ্ট্র ইতিহাসে কখনো শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেনি।
লেখক : গণমাধ্যম ও মানবাধিকার কর্মী।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ মনির হোসেন কাজী
বার্তা প্রবাহ পত্রিকা (রেজিঃ নং- ডিএ-৪০৪৯) এর একটি অনলাইন প্রকাশনা।
২/সি, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১000। মোবাইল : +৮৮ ০১৯ ১১৮০ ৪৫৮১
ই-মেইল : bartaprobah@yahoo.com