হাওরে ধানের শীষ, কৃষকের মনে আশার আলো

0
91

সুনামগঞ্জ  প্রতিনিধি : সুনামগঞ্জের কৃষকরা চলতি বোরো মওসুমে সময়মতো ফসলী জমি রোপন করতে না পারলেও হাওরে আবাদকৃত জমিতে ধানের শীষ দেখে তাদের মনে আশার আলো সঞ্চার হয়েছে। প্রতি বছরই মাঘ মাসের প্রথম সপ্তাহে হাওরের জমি ধান রোপনের কাজ শেষ করতেন কৃষকরা। এবার কৃষকদের সারা বছরের জমাট বাঁধা দু:খ কষ্ঠ পেরিয়ে তারা রোাপা জমি গুলোতে সেচ দিচ্ছেন। কিন্তু চলতি বোরো মওসুমে পানি নিষ্কাশনের কারণে সময় মতো ফসলী জমিতে কৃষকরা চাষ করতে না পারলেও যত টুকু জমি চাষ করেছেন তারা এখন নিড়ানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
গত বোরো মওসুমে ফসল ডুবির কারণে কৃষকদের সারা বছর গেছে দুর্দিনে। সেই ক্ষতি কখনো পুষিয়ে উঠতে পারবেন কি-না কৃষকরা তা জানেননা। এ অবস্থায় কৃষকদের মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করলেও ফসলের ভালো আবাদে কিছুটা আশ সঞ্চার হয়েছে তাদের মনে। সুনামগঞ্জের সদর উপজেলা, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, ধর্মপাশা, দিরাই, শাল্লা, বিশ^ম্ভরপুর উপজেলাসহ ১১টি উপজেলার- দেখার হাওর, শনির হাওর, মাটিয়ান হাওর, জুনিয়ার হাওর, সোনামোড়ল হাওর, খরচার হাওর, আঙ্গারুলী হাওর, কালিকোট হাওর, পাকনার হাওর, হালির হাওর, ধারাম হাওর, ধানকুনিয়া হাওর সহ বড়-বড় হাওরের বিস্তৃর্ণ ফসলী মাঠ এখন সবুজে সমারোহ। বোর ফসলের উপর নির্ভরশীল এ অঞ্চলের কৃষকরা আগামী বৈশাখ মাসে ধান গোলায় তোলার স্বপ্ন দেখছেন তারা। ধান গোলায় উঠলে কৃষকদের পরিবার আনন্দময় হয়ে উঠবে। নতুবা বিষাদের ছায়া নেমে আসবে। গত বছর পানি উন্নয়ন বোর্ডের লাগামহীন দুনীতি আর অনিয়মের কারণে ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে একের পর এক হাওর ডুবে ফসল হারিয়ে এ জেলার কৃষকরা স্বর্বসান্ত হয়েছেন। গত বছরের মার্চের শেষ ও এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের বৃষ্টি কাল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল কৃষকদের। এ কারণেই জেলা বাসীর দৃষ্টি এখন হাওরের ফসল রক্ষা বেরী বাঁধ নির্মানের দিকে। ১৫ ডিসেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারীর মধ্যে জেলার সব কয়টি বেরীবাধ নির্মান করার কথা থাকলেও তা হয়নি। দু‘ দফা সময় বাড়ালেও এখনও কিছু বাঁধে কাজ চলছে। তাই  ফসল হারানোর শঙ্কা এবারও কাটছে না কৃষকদের।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর সুনামগঞ্জ জেলায় ১১টি উপজেলার ছোট বড় ১৫৪ টি হাওরে ২ লাখ ২২ হাজার ৫ শত ৫২ হক্টর বোরো জমিতে চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় ১৬ হাজার ৬৯ হেক্টর। দক্ষিণ সুনামগঞ্জ ২২ হাজার ৩ শত ২৯ হেক্টর। জামালগঞ্জে ২৪ হাজার ৬ শত ৯ হেক্টর। ধর্মপাশা ৩১ হাজার ৭ শ ৯৬ হেক্টর। তাহিরপুর ১৮ হাজার ৩ শত ৩৫ হেক্টর। দিরাই ২৭ হাজার ৯ শত ৫৪ হেক্টর। শাল্লা ২১ হাজার ৯ শত ৯৯। জগন্নাথপুর ১৫ হাজার ৩৫ হেক্টর। বিশ^ম্ভরপুর ১১ হাজার ৩ শত ৩৫ হেক্টর। ছাতক ১৪ হাজার ১ শ ৯৯ হেক্টর। দোয়ারা ১৩ হাজার ৬ শত ৩৯ হেক্টর। গত বছর বন্যায় সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কৃষকরা ঘুরে দাঁড়াতে পারছেননা। যদি লক্ষমাত্র অনুযায়ী জমিতে চাষাবাদ হয় আর বৈরী আবহাওয়া না থাকে তা হলে সুনামগঞ্জের হাওর থেকে প্রায় ৩ হাজার ৩৭ কোটি টাকার ধান উৎপাদন হবে।। গত বছর হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মানে পাউবোসহ বাঁধ নির্মানকারীদের বিরুদ্বে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ঠিকাদার ও পাউবোর কর্মকর্তাদের বিরুদ্বে দুর্নীতির মামলা করে দুদক। সুনামগঞ্জ আইনজীবি সমিতির পক্ষ থেকে এডভোকেট আব্দুল হক বাদী হয়ে আরেকটি দুর্নীতির মামলা করেন পি আইসি, ঠিকাদার ও পাউবোর কর্মকর্তাদের বিরুদ্বে। গত বছর জেলার সব কয়টি হাওরের বাঁধ ভেঙ্গে আড়াই  হাজার কোটি টাকারও বেশী ফসল ডুবে যায়। সরাসরি ক্ষতিগ্রস্থ হয় জেলার ৩ লক্ষাধিক কৃষক পরিবার। এই ক্ষতির প্রভাব পড়ে সকল শ্রেণী পেশার মানুষের উপর। জেলার সর্বত্র দেখা দেয় অভাব অনটন। ধান-চালের দাম বেড়ে গেলে এ অঞ্চলের হাওর পারের মানুষ কাজের সন্ধানে ছুটে যায় দেশের বিভিন্ন স্থানে। গত বছরের ফসল বিপর্য়য়কে সামনে রেখে এবার পানি সম্পদ মন্ত্রনালয় বাঁধ নির্মানে নতুন নীতিমালা করে ঠিকাদারী প্রথা বাতিল করে। নীতিমালা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট হাওরের কৃষক এবং যাদের জমি হাওরে রয়েছে তাদের সমন্বয়ে পি আইসি গঠিত হয়। সরাসরি সংযুক্ত করা হয় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে তদারকি করছে। বিভিন্ন উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তারা দাবি করছেন জেলার হাওর রক্ষা বাঁধ প্রকল্পগুলোর কাজ প্রায় শেষ। কিছু কিছু প্রকল্পে (বাঁধে) ড্রেসিং, লেভেলিংসহ মাটি মজবুত করার কাজ চলছে। জামালগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম আল ইমরান, দিরাই উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মঈনউদ্দিন ইকবাল ও ধর্মপাশা উপজেলার নির্বার্হী কর্মকর্তা মো: মামুন খন্দকার জানান তাদের উপজেলার প্রকল্পগুলোর কাজ প্রায় শেষ। এবার কাজ ভাল হয়েছে। দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মঈন উদ্দিন ইকবাল আজকের সুনামগঞ্জ কে বলেন, তুফান খালী বাঁধ নিয়ে অনেকেই নানা কথা বলেছেন। এবার এ বাধ মজবুত ও সুন্দরভাবে নির্মান হয়েছে। জগন্নাথপুর ও শাল্লা উপজেলার কৃষকরা বলছেন, কিছু প্রকেল্পর কাজ এখনও চলছে। শাল্লা উপজেলায় কয়েকটি প্রকল্পের কাজে ধীর গতি হওয়ায় ‘হাওর বাচাও, সুনামগঞ্জ বাচাও‘ আন্দোলনের ব্যানারে মানব বন্ধন হয়েছে। দিরাই,শাল্লাসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা অভিযোগ তুলেছেন বাঁধের গোড়া থেকে পি আইসির সদস্যরা এক্সেভেটর দিয়ে বাঁধের গোড়া থেকেই গর্ত করে বাঁধে মাটি তুলেছেন । ফলে সামান্য বৃস্টিপাতে বাঁধ ভেঙ্গে  ফসল ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। গতবছর হাওর রক্ষা বাধের জন্য বরাদ্ব ছিল ৬৮ কোটি টাকা। এবার পানিসম্পদ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বরাদ্ব বাড়িয়েছেন। দেয়া হয়েছে ১ শত ২২ কোটি টাকা। সম্প্রতি জামালগঞ্জের ভান্ডা- মাখরখলা এলাকায় হাওর পাড়ে এক কৃষক সমাবেশ শেষে কোন কোন কৃষক মন্ত্রীর জন্য হাত তুলে দোয়া করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন “সব মন্ত্রীরা যদি এমন হতো“।
পানি উন্নয়নবোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: আবুবকর সিদ্দিক ভুঁইয়া বলেন, বাঁধের কাজ প্রায় শেষের দিকে। সার্বিক দিক থেকে বলা যায় ৯ শত ৬৪ টি প্রকল্পের ৮৯ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। কিছু প্রকল্পের কাজে মাটি লেভেলিং, ড্রেসিং, মজবুতকরনসহ দুর্বাঘাস লাগানো হচ্ছে। জগন্নাথপুর উপজেলার একটি প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় তিনি বলেন, এর মধ্যেই এটির কাজ শেষ হয়ে যাবে। বিভিন্ন স্থানে অপ্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মানের অভিযোগ সম্পর্কে পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন এ বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসকের সাথে কথা হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় বাঁধের বিলের বাকী বিল না দেওয়ার নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে।