সমুদ্র দিবসের আলোচনা : অমূল্য সম্পদ নষ্ট হচ্ছে, রক্ষায় প্রয়োজন মহাপরিকল্পনা

0
220

নিজস্ব প্রতিবেদক : যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে সাগরে থাকা অফুরান সম্পদ নষ্ট হচ্ছে। সম্পদের পরিমাণ ও এর ব্যবহারও জানা যাচ্ছে না। সাগরে কী পরিমাণ সম্পদ আছে, এগুলো কিভাবে ব্যবহার করা যাবে এজন্য এখনই মহাপরিকল্পনা নেয়া প্রয়োজন। বিশ^ সমুদ্র দিবসের আলোচনায় এমন বক্তব্য তুলে ধরেছেন বিশেষজ্ঞরা। সাগর সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন সেভ আওয়ার সি আয়োজিত ভার্চুয়ার আলোচনায় তাঁরা এসব কথা বলেন। আলোচনা অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন, সেভ আওয়ার সি’র সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ আনোয়ারুল হক।
প্রতি বছর ৮ জুন বিশ^ সমুদ্র দিবস পালিত হয়। ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরিওতে অনুুষ্ঠিত বিশ^ ধরিত্রী সম্মেলনে দিবসটি পালনের প্রস্তাব করে কানাডা। ২০০৪ সাল থেকে জাতিসংঘের উদ্যোগে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এবারে দিবসটির প্রতিপাদ্য, টেকসই সমুদ্রের জন্য উদ্ভাবন। অর্থাৎ উদ্ভাবনী কর্ম উদ্যোগের মাধ্যমে দীর্ঘ মেয়াদে সমুদ্র সম্পদ সংরক্ষণ করা।
এ প্রসঙ্গে আলোচনায় পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের জীববৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করা সেভ আওয়ার সি’র প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আনিসুজ্জামান খান বলেন, সাগরের সাথে সহবস্থান করেই আমাদের টিকে থাকতে হবে। এই সহবস্থানের জন্য প্রয়োজন উদ্ভাবন। উপকূলে বিভিন্ন দ্বীপ সুরক্ষায় বাঁধ দেয়া কার্যকর কোন সমাধান হবে না। বরং ঐ সব অঞ্চলে লবণাক্ততা সহিষ্ণু ধান, মাছ থেকে শুরু করে জীবন ধারণের অন্যান্য উপকরণ উদ্ভাবন করতে হবে। সমুদ্রকে ঠেকাতে বাঁধ তৈরিতে যত না অর্থ ব্যয় হয়ে, তার চেয়ে অনেক কম অর্থ ব্যয় হবে এসব উদ্ভাবনে।
তিনি বলেন, এসডিজি’র ১৪ নম্বর লক্ষ্যতে সাগরের কথা, সমুদ্র অর্থনীতির কথা বলা আছে। বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূল ও সমুদ্রে জুড়ে বহু সম্পদ আছে। তবে পরিবেশের তোয়াক্কা না করেই এলএনজি টার্মিনাল, গভীর সমুদ্র বন্দর, বড় বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ, চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলের বর্জ্য, কক্সবাজার সৈকতের অপরিকল্পিত হোটেল মোটেল নির্মাণ করায় সমুদ্রের অভ্যন্তরণে ও সমুদ্র সংলগ্ন এলাকার জীব বৈচিত্র্য আজ হুমকির মুখে।
সরকার বিভিন্ন এলাকায় পরিবেশগত সংকটাপন্ন হিসেবে ঘোষণা করলেও এর দেখভালের জন্য কোন লোকবল নেই। ২০২৫ সালের মত সাগর ও তৎসংলগ্ন ১০ শতাংশ এলাকাকে সংরক্ষিত করার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ১ শতাংশের মত করা হয়েছে। তবে মাছের ক্ষেত্রে ৩ শতাংশ এলাকা সংরক্ষণ করা হয়েছে বলে জানান চট্টগ্রাম মৎস অফিসের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শরিফ উদ্দিন। তিনি বলেন, সামুদ্রিক সম্পদ শুধু মাছ নয় এর বাইরেও আরো অনেক সম্পদ আছে।
এসব সম্পদ কোথায় কোথায় আছে, কী পরিমাণে আছে এবং এগুলোর ব্যবহারই বা কী সে লক্ষ্যে গবেষণা করার পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ ওসানোগ্রাফিক রিসার্চ ইন্সটিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু সাঈদ মো. শরিফ। এই গবেষণা করতে পারলে সমুদ্র সম্পদ ব্যবহারের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করা যাবে বলে তিনি জানান। বলেন, সম্পদের সুষ্ঠু ও টেকসই ব্যবহারের জন্য পরিকল্পনার বিকল্প নেই। তবে সমুদ্র প্রশ্নে এখনো আমাদের অদূরদর্শিতার অভাব আছে বলে তিনি মনে করেন।
ড. আনিসুজ্জামান খান বলেন, এসডিজিতে লাইফ বিলো ওয়াটারের কথা বলা হলেও আমরা জানি না সমুদ্রের নীচের পরিস্থিতি কী। সমুদ্রতলের পরিবেশ দেখার জন্য দক্ষ ডুবুরি প্রয়োজন। এজন্য দরকার প্রয়োজনীয় জাহাজ ও সরঞ্জাম। দরকার গবেষণা ও দক্ষ লোকবল। কিন্তু এসবের এখনো তেমন কিছুই করা হয়নি উল্লেখ করে আলোচকরা বলেন, মেরিন বিশ^বিদ্যালয় গুলো ঢাকা কিংবা অন্য জেলায় না করে সাগর তীরে করা উচিত। সমুদ্রতলের পরিবেশ কতটা ভালো তা নিশ্চিত করে প্রবাল। এমন তথ্য উল্লেখ করে ওশান এক্সপ্লোরার এসএম আতিকুর রহমান জানান, সেন্টামার্টিন ও তৎসংলগ্ন এলাকার প্রবাল এখন ভালো নেই। অতিরিক্ত পর্যটকদের চাপ, প্রতিদিন বড় বড় জাহাজ নোঙ্গর করায় এখনকার পরিবেশ, প্রতিবেশের ক্ষতি হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ও কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান লে. কর্ণেল (অব.) ফোরকান আহমদ বলেন, তার মতে সেন্টামার্টিনকে সুরক্ষায় সেখানে পর্যটক যাওয়া পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষায় স্থানীয় অধিবাসীদের কাজে লাগাতে হবে। তবে ওখানকার পর্যটন ব্যবসা হুট করে বন্ধ করার বিপক্ষে মত দিয়েছেন, জীববৈচিত্র্য গবেষক ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আল মোজাদ্দেদি আল আফসানি।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে কক্সবাজার উন্নয়ন কতৃপক্ষের চেয়ারম্যান জানান, সাগরতীরের হোটেল মোটল গুলো থেকে এখন সরাসরি বর্জ্য সাগরে ফেলা হচ্ছে না। বর্জ্য পরিশোধনের জন্য বললেও মালিকরা কথা শুনছে না বলে জানান তিনি। এক্ষেত্রে প্রশাসনের সহায়তাও অতটা পাওয়া যাচ্ছে না বলে তার অভিযোগ। ২০১৬ সালের পর কক্সবাজারে নতুন কোন হোটেল মোটেল নির্মাণের অনুমোতি দেয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তিনি জানান, সেন্টমার্টিনসহ কক্সবাজারের উন্নয়নে ৬৯০ বর্গ কিলোমিটার এলাকাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। সে অনুযায়ী কাজও চলছে। সাগরের কাছিম, লাল কাঁকড়া, সাগর লতা সংরক্ষণে চারটি জোন ভাগ করা হয়েছে। এসব জোনে বাঁশের বেড়া দেয়া হলেও সম্প্রতি আম্পানে তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া মেরিন ড্রাইভের পূর্বপাশ বরাবর ১ লাখ গাছ রোপণের কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে বলে জানান ফোরকান আহমদ।
আলোচনায় অংশ নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপপরিচালক এস কে নাজমুল হুদা জানান, সেন্টমার্টিনের ছেড়া দ্বীপের পরিবেশ সুরক্ষায় তাদের দপ্তর একটি জোন চিহ্নিত করে কাজ শুরু করেছে। পাহাড় কাটা বন্ধ ও চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলের দূষণ বন্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। প্লাস্টিকের দূষণ রোধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা হচ্ছে। এছাড়া জাহাজ গুলো থেকে দূষণ বন্ধে বড় অংকের জরিমানা করা হচ্ছে।
সমুদ্রের পরিবেশকে সুরক্ষা দিয়ে এর সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের কথা তুলে ধরেন চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরিণ আক্তার। তিনি বলেন, অধিকহারে ও অপরিকল্পিত মাছ ধরার ফলে সমুদ্রের মৎস সম্পদ হারিয়ে যাচ্ছে। এটা রোধ করতে হবে। পাশাপাশি সমুদ্র তরঙ্গ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন কৌশল রপ্ত করার উপর গুরুত্ব দেন তিনি। পরিবেশ সম্মত প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও বিতরণ প্রতিষ্ঠান গ্রিণ টেক এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লুৎফর রহমান জানান, পানিতে ভাসমান সৌর প্যানেল স্থাপনে বিদ্যুৎ বিভাগের সাথে তারা কাজ করছেন।