রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে জাতিসংঘে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সতর্কতা

0
35

অনলাইন ডেস্ক : মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রাণ বাঁচাতে ছুটে আসা রোহিঙ্গাদের সমস্যা সমাধান না হলে সেটি গোটা অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হবে বলে জাতিসংঘে দেয়া এক বক্তব্যে সতর্ক করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল।
বিশাল এই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ও পরিবেশগত ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলছে উল্লেখ করেমন্ত্রী বলেন, ‘এর সমাধান না হলে আমাদের অঞ্চল ও এর বাইরে এই রোহিঙ্গা সমস্যা শান্তি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তীব্র প্রভাব ফেলবে’।
মঙ্গলবার জাতিসংঘের উচ্চ পর্যায়ের সভায় ‘শান্তি বিনির্মাণ ও টেকসই শান্তি’ শীর্ষক এক আলোচনায় অংশ নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি মিরোস্লাভ লাইচ্যাকের আহ্বানে উচ্চপর্যায়ের এই সভা হয়।
এ সভায় বেলজিয়ামের রাজা; কলম্বিয়া, আয়ারল্যান্ড, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক ও গাম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট; এস্তোনিয়ার প্রধানমন্ত্রী; জজির্য়া ও ক্রোশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী, ৪০টিরও বেশি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, অন্যান্য দেশের মন্ত্রী, উপমন্ত্রীসহ ১৩১টি দেশ ও সংস্থার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিগণ অংশ নেন। সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিনিধিত্ব করছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এ সময় রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রদত্ত ভাষণের পাঁচ দফা সুপারিশের কথা এবং কফি আনান কমিশনের রিপোর্টের শর্তহীন পূর্ণ বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
মিয়ানমার তার রাখাইন রাজ্যে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদেরকে নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না। ৮০ দশক থেকেই নানা সময় সেনা অভিযানের ‍মুখে তারা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। সবশেষ গত আগস্টে সেনা অভিযানের মুখে সবচেয়ে বড় অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছে।
শুরুতে বাংলাদেশ বাধা দিলেও রাখাইন রাজ্যের করুণ পরিস্থিতির কথা জানার পর সীমান্ত খুলে দেয়। আর এখন ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা কক্সবাবারের আশ্রয় শিবিরে অবস্থান করছে।
রোহিঙ্গাদেরকে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক এবং ফিজিক্যাল অ্যারাঞ্জমেন্ট চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু যেন মিয়ানমারের টালবাহানার কোনো শেষ নেই। তারা প্রত্যাবাসন আটকে রাখছে নানা অযুহাতে।
বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানন্ত্রী বলেছেন আমরা যদি আমাদের ১৬০ মিলিয়ন মানুষকে খাওয়াতে পারি, তবে এই এক মিলিয়ন অসহায় রোহিঙ্গাদেরও খাওয়াতে পারব, প্রয়োজনে আমরা ভাগ করে খাবার খাব’।
টেকসই শান্তি বিনির্মাণে বাংলাদেশ গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘স্থায়ী শান্তি বিনির্মাণে আমাদের সরকার দারিদ্র্য বিমোচন, মানব উন্নয়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে।’
“যুদ্ধ ও সহিংসতার পরিবর্তে মানুষের মনে শান্তির সংস্কৃতি প্রোথিত করতে আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশ অনুসৃত ‘কালচার অব পিস’ পদক্ষেপের পাশাপাশি আমরা টেকসই শান্তি এজেন্ডাকেও এগিয়ে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতি বাংলাদেশের যে প্রতিশ্রুতি তা স্বাধীনতা সংগ্রামের বীরোচিত ইতিহাস থেকে এসেছে বলে জানান মন্ত্রী বলেন, ‘বাঙালি জাতি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ইতিহাসের ভয়াবহতম গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের শিকার হয়েছিল।
সন্ত্রাস দমনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘জিরো টলারেন্স নীতি’র কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, প্রতিবেশী কোন দেশের বিরুদ্ধে যাতে কেউ আমাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না পারে সে বিষয়ে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। মৌলবাদ ও সহিংস চরমপন্থা দমনে আমরা সবসময়ই স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিবিড় অংশগ্রহণকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আসছি।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ অংশীদার উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বেসামরিক জনগণের সুরক্ষা প্রদানসহ সমস্যাসংকুল জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় গত তিন দশক ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে আমরা আমাদের সামর্থ ও পেশাদারিত্বের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে যাচ্ছি। সংঘাতময় পরিস্থিতিতে যেন সহিংসতা প্রতিরোধে বাংলাদেশ সবসময়ই উচ্চকণ্ঠ।
উন্নয়ন ও মানবিক সহায়তা খাতের অর্থ বরাদ্দ না কমিয়ে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের জন্য বর্ধিত এবং সুনিশ্চিত অর্থায়ন নিশ্চিত করার জোর তাগিদ জানান আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল।
সভায় জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি মাসুদ বিন মোমেন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন নিরাপত্তা বিভাগের সচিব মোস্তফা কামালও উপস্থিত ছিলেন।
সভা শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যুক্তরাজ্যের কমনওয়েলথ স্টেট বিষয়ক মন্ত্রী লর্ড আহমাদ, নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিজ মারিয়ে এরিখসেন সরিডি, এস্তোনিয়ার ডেপুটি ফরেন মিনিস্টার ভায়নো রেইনআর্ট, সশস্ত্র সংঘাতের সময় যৌন সহিংসতা প্রতিরোধ বিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ প্রতিনিধি প্রমিলা প্যাটেলের সঙ্গে আলাদা আলাদা বৈঠক করেন।
এসব দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় ছাড়াও রোহিঙ্গা সঙ্কট ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।