রাষ্ট্রায়ত্ত তিন ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি

0
11

অনলাইন ডেস্ক : রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী এই চার ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার খুব একটা উন্নতি হচ্ছে না। ২০১৮ সালে ব্যাংকগুলোর ব্যবসা পরিচালনার বিভিন্ন সূচকে মিশ্র প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। লোকসানি শাখা কমলেও বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণ রয়েছে ব্যাংকগুলোতে। কারো কারো প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি দুই-ই রয়েছে। শীর্ষ-২০ খেলাপির কাছ থেকে নগদ আদায় পরিস্থিতিও সন্তোষজনক নয়।
রবিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বৈঠকে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বৈঠকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ও শীর্ষ খেলাপিদের থেকে আদায় পরিস্থিতি সন্তোষজনক না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়ছ।
গভর্নর ফজলে কবিরের সভাপতিত্বে বৈঠকে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী ছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস এম মনিরুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক মো. মাসুম কামাল ভুঁইয়া, কাজী ছাইদুর রহমান ও মো. রবিউল হাসান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত এই চার ব্যাংকের ৩টিই প্রভিশন ঘাটতিতে রয়েছে। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের ৩ হাজার ৮৮ কোটি, অগ্রণী ব্যাংকের ৫৯৩ কোটি ও রূপালী ব্যাংকের ৮৩৪ কোটি টাকা প্রভিশন ঘাটতি ছিল। অন্যদিকে, এ সময়ে জনতা ও অগ্রণী ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে ছিল। এর মধ্যে জনতা ব্যাংকের ৫ হাজার ৮৫৩ কোটি ও অগ্রণী ব্যাংকের ৮৮৩ কোটি টাকা মূলধন ঘাটতি রয়েছে।
বৈঠক সূত্রমতে, ২০১৮ সালে শীর্ষ-২০ খেলাপিদের কাছ থেকে নগদ আদায় পরিস্থিতিও সন্তোষজনক ছিল না ব্যাংকগুলোর। এ সময়ে সোনালী ১১৯ কোটি, জনতা ৯৯ কোটি, অগ্রণী ১ কোটি ৭৪ লাখ ও রূপালী ৫ কোটি টাকা নগদ আদায় করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে, অন্যান্য খেলাপিদের থেকে সোনালী ৮৮৮ কোটি, জনতা ৩৮৪ কোটি, অগ্রণী ৩১৭ কোটি ও রূপালী ১৮০ কোটি টাকা আদায় করে।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের মধ্যে রূপালী ব্যাংক ছাড়া দুই ব্যাংকেরই খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৭ হাজার ২২৫ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ ছিল জনতা ব্যাংকের; যা ব্যাংকটির মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ। ২০১৭ সালে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ৭ হাজার ৫৯৯ কোটি টাকা। এ সময়ে অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ৫ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে যা ছিল ৫ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা। সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কিছুটা কমে হয়েছে ১২ হাজার ৬১ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে যা ছিল ১৪ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা। এ ছাড়া রূপালী ব্যাংকেরও খেলাপি ঋণ কিছুটা কমে হয়েছে ৪ হাজার ১১০ কোটি টাকা; যা ২০১৭ সালে ছিল ৪ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ব্যাংকগুলোর ২০১৮ সালের সার্বিক আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে এই বৈঠক হয়েছে। এতে দেখা গেছে, এ সময়ে তারা বেশকিছু সূচকে ভালো করেছে। আবার কিছু কিছু সূচকে সফল হয়নি। যেমন তাদের খেলাপি ঋণ এখন উচ্চমাত্রায় রয়েছে। শীর্ষ খেলাপিদের থেকে আদায় সেভাবে বাড়েনি। এ ছাড়া মুনাফা অর্জনের টর্গেটও অর্জন হয়নি। বৈঠকে খেলাপি ঋণসহ পিছিয়ে পড়া সূচকে উন্নতি করার ওপর জোরারোপ করেছেন গভর্নর।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালে আমানতের প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি ২৩ শতাংশ ছিল রূপালী ব্যাংকের। এ ছাড়া অগ্রণীর ১৭ দশমিক ৪২ শতাংশ, সোনালীর ৪ দশমিক ৮১ শতাংশ ও জনতার ৪ দশমিক ০২ শতাংশ আমানতের প্রবদ্ধি হয়। অন্যদিকে, গত বছর সর্বোচ্চ ১৯ দশমিক ৯১ শতাংশ ঋণের প্রবৃদ্দি হয় অগ্রণী ব্যাংকের। এ ছাড়া জনতার ১৫ দশমিক ৬২ শতাংশ, রূপালীর ১৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ ও সোনালীর ১০ দশমিক ৭৮ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
বৈঠক সূত্রে আরও জানা যায়, ২০১৮ সালে পরিচালন ব্যয় প্রায় একই ছিল রূপালী ব্যাংকের, ৭৭০ কোটি টাকা। জনতা ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় আগের বছরের চেয়ে ১০৬ কোটি টাকা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা। অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় ২৮ কোটি টাকা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। তবে সোনালী ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় প্রায ৫২ কোটি টাকা কমে হয়েছে ১ হাজার ৮৯৭ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, ২০১৮ সালে সোনালী ও রূপালী নীট মুনাফা অর্জনে সক্ষম হলেও লোকসানে ছিল জনতা ও অগ্রণী। তবে গত বছর লোকসানি শাখা কমে এসেছে সব ব্যাংকেরই। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে রূপালীর লোকসানি শাখার সংখ্যা ছিল ৩৩টি। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮টি। ২০১৭ সালে সোনালী ব্যাংকের লোকসানি শাখা ১৮১টি থাকলেও ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে নেমে এসেছে ৯৩টিতে। অগ্রণী ব্যাংকের ২০১৭ সালে ছিল ৪৩টি, তা ২০১৮ সালে দাঁড়িয়েছে ২১টি। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে জনতা ব্যাংকের শাখা ৫৭টি থাকলেও এক বছরের ব্যবধানে ২০১৮ সালে মাত্র ১টি কমে দাঁড়িয়েছে ৫৬টিতে।
সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে ২০০৭ সাল থেকে সমঝোতা চুক্তি (এমওইউ) করে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এমওইউতে খেলাপি ঋণ আদায়, ঋণ প্রবৃদ্ধি যথাযথ রাখা, লোকসানি শাখা ও পরিচালন ব্যয় কমানো, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ৩ মাস পর পর ব্যাংকগুলোর সঙ্গে নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে এসব লক্ষ্য অর্জনের মূল্যায়ন করা হয়। গতকাল ২০১৮ সালের ডিসেম্বর ভিত্তিক আর্থিক প্রতিবেদন নিয়ে এই বৈঠক হয়।