যানজটের কারণে থমকে যাচ্ছে চট্টগ্রাম

0
55

মোঃ সিরাজুল মনির, চট্টগ্রাম : সদরঘাট এলাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন পতেঙ্গার ডেইলপাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ ইমতিয়াজ। সকাল ৯.৩০ এর অফিস ধরতে তাঁকে বাসা থেকে বের হতে হয় সাতটায়। আর বিকেল পাঁচটায় অফিস শেষে ঘরে ফিরতে ফিরতে রাত ৮টা। একইভাবে অক্সিজেন এলাকার বাসা থেকে আরমানের কর্মস্থল চট্টগ্রাম ইপিজেডে যেতে বাসা থেকে বের হতে হয় ভোর ছয়টায়। অথচ তাঁর অফিস শুরু ৮টা থেকে। বিকেলেও ঠিক একইভাবে দেড় থেকে পৌনে দুই ঘণ্টা বাসে ঝিমুতে ঝিমুতে ফিরতে হয় তাঁকে।সদরঘাট থেকে পতেঙ্গার দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার। অক্সিজেন থেকে চট্টগ্রাম ইপিজেডের দূরত্বও প্রায় একই। স্বাভাবিকভাবে এ দুটি গন্তব্যে বাসে যাতায়াত করতে ২০ থেকে ৩০ মিনিট সময় লাগার কথা। কিন্তু বারিক বিল্ডিং থেকে সিমেন্ট ক্রসিং পর্যন্ত যানজটের কারণে এই দুই পথ একবার পাড়ি দিতে সময় লেগে যাচ্ছে দেড় থেকে পৌনে দুই ঘণ্টা। এভাবে প্রতিদিন যাওয়া-আসায় দুই ঘণ্টারও বেশি সময় অপচয় হচ্ছে যাত্রীদের।

যানজটের পেছনে : সরেজমিনে পরিদর্শন করে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে পতেঙ্গা ও বিমানবন্দরকেন্দ্রিক সড়কে যানজটের পেছনে বেশ কয়েকটি বড় কারণ পাওয়া গেছে। তার মধ্যে-বন্দরকেন্দ্রিক গাড়ির চাপ, সড়কের পাশে কনটেইনার ডিপো স্থাপন, সড়কের ওপর গাড়ি পার্কিং, ফুটপাত দখল এবং ভাঙা সড়ক অন্যতম।

চট্টগ্রাম বন্দরের হিসাবে দৈনিক প্রতিদিন ৬ থেকে ৭ হাজার ভারী যানবাহন বন্দরের ভেতরে আসা-যাওয়া করে। তবে ২০১৭ সালে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চট্টগ্রাম স্ট্রাটেজিক আরবান ট্রান্সপোর্ট মাস্টারপ্ল্যানের জরিপে দেখা গেছে সিডিএ এভিনিও, পোর্ট কানেক্টিং রোড, স্ট্র্যান্ড রোড, ঢাকা ট্রাঙ্ক রোড, আগ্রাবাদ এক্সেস রোড, জাকির হোসেন রোড, আরাকান রোড ও মেরিনার্স রোড দিয়ে সারাদেশে আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহন হয়। এসব সড়কে প্রতিদিন গড়ে ৩৫ হাজার ট্রাক চলাচল করে। চট্টগ্রাম বে টার্মিনাল ও গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ হলে ২০৩০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা প্রতিদিন ১ লাখ ১৩ হাজারে দাঁড়াতে পারে বলে মাস্টারপ্ল্যানে পূর্বাভাস দেয়া হয়।

এছাড়া একই সড়কের পাশে থাকা দুটি ইপিজেডে প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক কাজ করেন। তাঁদের আনা-নেয়ার জন্য প্রতিদিন হাজারো গাড়ি এই সড়কে যাতায়াত করে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজের জন্য বর্তমানে সিমেন্ট ক্রসিং থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত সড়ক সংকুচিত হয়ে গেছে। এতেও গাড়ি চলাচলে ব্যাঘাত ঘটছে।

এসব কারণে বারিক বিল্ডিং থেকে সিমেন্ট ক্রসিং পর্যন্ত ছয় কিলোমিটার সড়কের নিমতলা, চট্টগ্রাম ইপিজেড, সিমেন্ট ক্রসিং এলাকায় দিনভর যানজট লেগে থাকে। এ কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়মিত ভোগান্তিতো আছেই, প্রায় সময় বিমানযাত্রীদের ফ্লাইট মিস করার ঘটনাও ঘটছে।

ছয় কিলোমিটার এই সড়ক পার হতে বাসে ২০ মিনিট লাগার কথা। কিন্তু এর বিপরীতে পৌনে এক ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা সময় লেগে যাচ্ছে। এতে ওই সড়কে প্রতিদিন চলা কমপক্ষে ১০ হাজার গাড়ির প্রতি ট্রিপেই প্রায় ৩০-৪০ মিনিট করে সময় অপচয় হচ্ছে।
বাসের গতি মাত্র ১০ কিলোমিটার

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চট্টগ্রাম স্ট্রাটেজিক আরবান ট্রান্সপোর্ট মাস্টারপ্ল্যানের এক জরিপে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম নগরে বিকেল বেলায় গড়ে বাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১০ দশমিক ৩ কিলোমিটার। অন্য গণপরিবহনের মধ্যে সিএনজি অটোরিকশা ১১ দশমিক ৭ কিলোমিটার, টেম্পো ১২ দশমিক ৭ কিলোমিটার ও রিকশা ৮ দশমিক ২ কিলোমিটার। তবে স্থানীয়দের দাবি, বারিক বিল্ডিং থেকে সিমেন্ট ক্রসিং পর্যন্ত সড়কে এই গতিবেগ আরও কম হবে।

অথচ চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. স্বপন কুমার পালিত বলেন, ‘বাণিজ্যিক নগরে বাসের স্বাভাবিক গতিবেগ গড়ে অন্তত ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত হওয়া দরকার। আর গ্রামে এই গতিবেগ ৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু যানজটের কারণে চট্টগ্রাম নগরে গাড়ির গতিবেগ কমে যাচ্ছে।’
কনটেইনার ডিপোগুলো সরিয়ে নিলে, ফুটপাত দখলমুক্ত করলে এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মিত হলে যানজট অনেকাংশ কমে যাবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। কারণ, ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মিত হলে লালখানবাজার থেকে বিমানবন্দর-পতেঙ্গা পর্যন্ত যেতে সময় লাগতে পারে সর্বোচ্চ ১৫ মিনিট।

প্রতিদিন যানজটের শিকার হলে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব পড়ে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এস এম মনিরুল হাসান। তিনি বলেন, ‘যানজটের কারণে মানুষের অফিস মিস হয়, নানা প্রোগ্রাম বাতিল করতে হয়। এর ফলে মানসিক চাপ তৈরি হয়। আর এ থেকে পারিবারিক অশান্তিও সৃষ্টি হয়। একই কারণে মানুষের কর্মদক্ষতা ও কর্মস্পৃহাও নষ্ট হয়ে যায়।’