নবী-রসুলগণ বিশুদ্ধ ভাষায় কথা বলতেন

0
287

মুফতি মুহাম্মদ আল আমিন
দুনিয়াতে যত নবী-রসুল এসেছেন সবাই বিশুদ্ধ মাতৃভাষায় কথা বলতেন। মায়ের ভাষায় ইসলামের দাওয়াত দিতেন। মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করতেন। তাওহিদ বা একাত্মবাদের দিকে ডাকতেন। কেউ অশুদ্ধ ভাষায় কথা বলতেন না। গ্রাম্য ভাষায় দীনের দাওয়াত দিতেন না। নবী-রসুলগণ বিদেশি ভাষাও ব্যবহার করতেন না। মাতৃভাষাকে তারা অনেক বেশি ভালোবাসতেন। হৃদয় থেকে মহব্বত করতেন। কারণ মাতৃভাষা মহান আল্লাহর এক বড় নেয়ামত। অপূর্ব দান।
মানুষ সৃষ্টি করে আল্লাহ তাকে কথা বলার জন্য এবং মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য মাতৃভাষা দান করেছেন। তাই মাতৃভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। নবী-রসুলগণকে মাতৃভাষার বিশুদ্ধ জ্ঞান দিয়ে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনের সূরা ইবরাহিমের ৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহপাক ইরশাদ করছেন, ‘আমি দুনিয়াতে যত রসুল পাঠিয়েছি (আল্লাহর পথে মানুষকে দাওয়াত দেওয়ার জন্য) প্রত্যেককে তার স্বজাতীর ভাষা (মাতৃভাষা) দিয়ে পাঠিয়েছি, যেন সে তার জাতিকে (মাতৃভাষায় দীনের কথা) বোঝাতে পারে।’ অর্থাৎ আল্লাহর পথে মাতৃভাষায় জনগণকে যেন আহ্বান করতে পারে, এ জন্য নবী-রসুলগণকে মাতৃভাষার জ্ঞান দিয়ে দুনিয়াতে পাঠানো হয়েছে।
প্রিয়নবী (সা.) বলেন, আমি আরবের সবচেয়ে বিশুদ্ধভাষী। এ ছাড়াও আমার গোত্র কোরাইশ বংশ আরবি শব্দ চয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিশুদ্ধভাষী। আর আমি যেখানে লালিত-পালিত হয়েছি (হালিমা সাদিয়ার গৃহে দুধ পান করা অবস্থায়) সেই বনু সা’দ গোত্র হলো উচ্চারণের ক্ষেত্রে আরবের সবচেয়ে বিশুদ্ধভাষী। কোরাইশ বংশের লোকেরা তাদের গদ্যে এবং পদ্যে সুন্দর এবং চমৎকার আরবি শব্দ চয়ন করতে পারত। আর বনু সাদ গোত্রের লোকেরা কথা বলত খুব সুন্দর উচ্চারণে। এ জন্য আল্লাহতায়ালা তার প্রিয় রসুলকে এখানে জন্ম এবং লালনপালনের ব্যবস্থা করেছেন।
মাতৃভাষায় বিভিন্ন প্রবন্ধ এবং কাব্য রচনা করাও একটি বিরাট সওয়াবের কাজ। বিখ্যাত সাহাবি হজরত হাসসান ইবনে সাবিত (রা.) ছিলেন মাতৃভাষায় কবিতা রচনায় পারদর্শী। এ জন্য রসুল (সা.) তাকে সব সময় উৎসাহিত করতেন যেন কবিতার মাধ্যমে সে ইসলামের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলে। পাশাপাশি কাফেরদের কূটকৌশল ও ষড়যন্ত্র সম্পর্কে মানুষকে সজাগ করতে পারে।
প্রিয়নবী (সা.) যখন যুদ্ধে যেতেন, প্রায় যুদ্ধেই হাসসান ইবনে সাবেত (রা.)-কে কবিতা রচনা করার জন্য নিয়ে যেতেন। যেন তার কবিতা রচনা এবং আবৃত্তি শুনে মুসলিম সেনাবাহিনীর মধ্যে উদ্দীপনা জাগে। প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। সাহস বাড়ে। আর কাফের যোদ্ধাদের মনোবল ভেঙে পড়ে। মুসলিম শিশু-কিশোরদের মাতৃভাষা শেখানোর প্রতি রসুল (সা.) বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন।
বদরের যুদ্ধে যেসব কাফের পরাজিত হয়ে মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়, তখন তাদের কাছ থেকে মুক্তিপণ নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু কিছু কাফের এমন ছিল যে, মুক্তিপণ দেওয়ার মতো কোনো টাকা-পয়সা, অর্থ-সম্পদ তাদের কাছে ছিল না। তখন রসুল (সা.) সিদ্ধান্ত দিলেন যে, এরা প্রত্যেক কাফের দশজন মুসলমান শিশু-কিশোরকে মাতৃভাষায় লেখা ও পড়া শেখাবে। তাহলে তাদের কাছ থেকে আলাদা করে আর মুক্তিপণ নেওয়া হবে না। মুসলমান শিশু-কিশোরকে মাতৃভাষা শেখানোই মুক্তিপণ হিসেবে গণ্য হবে।
মহান আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে বিশুদ্ধ মাতৃভাষা শিক্ষা গ্রহণ করার তৌফিক দান করেন। আমিন।
লেখক : খতিব, সমিতি বাজার মসজিদ, নাখালপাড়া, ঢাকা।