ধর্ষন রোধে সামাজিক প্রেক্ষাপটে আমাদের দায়বদ্ধতা

0
74

এস ইবাদুল ইসলাম : আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, ধর্ষনের মূল কারন হচ্ছে কোন ব্যক্তির মানসিক বিকৃতি, পারিবারিক শিক্ষার অভাব, সামাজিক সচেতনতা, নারীপুরুষের সম অধিকারের অপব্যবহার এবং সর্বপরি আইনের শাসনের প্রয়োগ না হওয়া।
দেখুন একজন মানুষ হিসেবে একজন নারী বা পুরুষ অবশ্যই তার ইচ্ছেমাফিক পোষাক পড়তে পারে। এটা তার অধিকার এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার ব্যাপার। তবে তিনি কিভাবে এই অধিকার এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা প্রয়োগ কিভাবে করছেন সেটা বিবেচনার বিষয়। যেমন ধরুন, আপনি প্রকাশ্যে কোন মূল্যবান জিনিস প্রদর্শন করে নিয়ে যেতেই পারেন। এটা আপনার নাগরিক অধিকার। সেই সাথে আপনার সেই মূল্যবান জিনিসকে সঠিক নিরাপত্তার মাধ্যমে আপনার গন্ত্যবে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আপনার সচেতনতা এবং দায়িত্ব। এখন কোন কারনে নিরাপত্তাজনিত কোন সমস্যায় আপনি যদি আপনার মূল্যবান জিনিসটি হারিয়ে ফেলেন, তাহলে রাষ্ট্র যেমন দায়ী হবে তেমনি সচেতনতার অভাবে আপনিও কম দায়ী হবেন না। তখন যদি আপনি এক তরফা ভাবে রাষ্ট্রকে দায়ী করেন তাহলে সেটা খুব বেশি গ্রহন যোগ্য হবে না।
আমি মনে করি পোষাক, আচরন ইত্যাদি ক্ষেত্রে শালীনতার যে বিষয়টি বার বার বলা হচ্ছে তা মূলত শুধু কোন এক পক্ষের জন্য নির্দিষ্ট নয়। বরং শালীনতা একটি সার্বজনীন ব্যাপার। নারী পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই ব্যাপারটি সমান ভাবে প্রযোজ্য। যারা শুধু মাত্র নারীর পোষাককে ধর্ষনের জন্য দায়ী করেন তারা সংকীর্ন দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় বহন করে। শুধুমাত্র অশালীন পোষাকের কারনে ধর্ষন – কোন ভাবেই গ্রহনযোগ্য নয়। যারা এমনটা ভাবেন তাদের কাছে আমার বিনীত অনুরোধ, ভাই আপনারা বিদেশে কখনও যদি যান (উচ্চ শিক্ষা ও বেড়ানো) তাহলে দয়া করে
শুধু মাত্র আফগানিস্থান, সৌদি আরব কিংবা মরুভূমি অঞ্চলে যাবেন। কারন অন্য কোন সভ্য দেশে গেলে আপনি এই অশালীন পোষাক দেখে দেখে নিজেও একজন ধর্ষক হয়ে যেতে পারেন। তবে ব্যতিক্রম যে নেই, তা কোন ভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই।
গুটি কয়েক নারী নিজেদের অতি আধুনিক প্রমান করতে গিয়ে অশালীন পোষাক, অন্য নারীদের জন্য অপমানসূচক অপবাদ বয়ে আনছেন এবং তার কারনে সৃষ্ট কামনায় বলী হচ্ছে অন্য আর একজন নিরীহ নারী।
ধর্ষনের মূল কিছু কারন হচ্ছে ইভটিজিং, অপসংস্কৃতির প্রভাব, মোবাইল পর্ণোগ্রাফি এবং আইনের শাসন প্রয়োগের দূর্বলতা। ইভটিজিং যারা করে তারা যদি সঠিক সময়ে বাধা না পায়, বা সংশোধনের সুযোগ না পায় তাহলে তারা পরবর্তীতে ধর্ষক হিসেবে পরিনত হয়। আমাদের দেশে যদিও এখন অনেক সচেতনতা বেড়েছে কিন্তু তারপরও ইভটিসিং বন্ধ করতে না পরলে ধর্ষb বন্ধ হবে না।
তাছাড়া আমি মনে করি আমাদের দেশে ধর্ষন বেড়ে যাওয়ার অন্যতম আরেকটি কারন হলো রুট লেভেলে সঠিক বিনোদনের ব্যবস্থা না থাকাটা। এখানে বিনোদনের নামে নানা অপসংস্কৃতি ঢুকে যাচ্ছে আমাদের দেশীয় সংস্কৃতিতে। যেমন চায়ের দোকানে একটি হিন্দি সিনেমা দেখানো হচ্ছে। শিশু থেকে নিয়ে বৃদ্ধরা পর্যন্ত বসে বসে সিনেমাটি দেখছেন। এই ধরনের সিনেমা অবশ্যই একজন শিশু বা তরুনের সুষ্ঠ মানসিক বিকাশকে ব্যহত করে। তরুনরা বিজাতীয় সংস্কৃতির অনেক কিছুই দেখে প্রলুব্ধ হচ্ছে। একপর্যায়ে এই অদমিত ইচছা তাকে ধর্ষকে পরিনত করছে।
ধর্ষন পৃথিবীর প্রাচীনত অপরাধগুলোর মধ্যে একটি। বাংলাদেশও ধর্ষক নামক ঘৃন্য নরপশুদের হাত থেকে মুক্ত নয়। একটি বেসরকারী মানবঅধিকার সংস্থার প্রতিবেধন অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারী থেকে সেপ্টেম্বর এই নয় মাসে ৩৩৮ জন নারী ও শিশু ধর্ষনের ঘটনা ঘটেছে। এদের মধ্যে ১৫৮ জন নারী ও ১৮০ জন মেয়ে শিশু।
১৫৮ জন নারীকে ধর্ষনের পর হত্যা করা হয়েছে আর ৬৮ জন গনধর্ষনের শিকার হয়েছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এ বছর এ পর্যন্ত মোট ধর্ষনের ঘটনা ঘটে ২৪৮টি, গনধর্ষন হয় ১১৬টি, ধর্ষনের পর হত্যা ৮৭টি।
যারা এই বিষয়ে সামাজিক আন্দোলন করছেন তারা অনেকেই ধর্ষনের শাস্তির হিসাবে একমাত্র মৃত্যুদন্ডের কথা বলেছেন। আমি আইনের লোক এই সংক্রান্ত একটি কঠোর আইন ইতিমধ্যে প্রনয়ন করা হয়েছে এবং এই সংক্রান্ত সকল বিচার স্পেশাল ট্রাইবুন্যালের মাধ্যমেই হয়। আপনাদের জানার সুবিধার জন্য নিচে ধর্ষনের শাস্তির বিধান তুলে aiলাম।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০(সংশোধনী ২০০৩) অনুসারে শাস্তির বিধান
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩) – এর ৯ ধারা অনুযায়ী ধর্ষণের অপরাধের যে সকল শাস্তির বিধান রয়েছে তা হলো:
(১) যদি কোন পুরুষ কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহা হইলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদন্ডেও দন্ডনীয় হইবেন৷
(২) যদি কোন ব্যক্তি কর্তৃক ধর্ষণ বা উক্ত ধর্ষণ পরবর্তী তাহার নিষেধ কার্যকলাপের ফলে ধর্ষিতা নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি মৃত্যুদন্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অন্যূন এক লক্ষ টাকা অর্থদন্ডেও দন্ডনীয় হইবেন৷
(৩) যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন এবং ধর্ষণের ফলে উক্ত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে বা তিনি আহত হন, তাহা হইলে ঐ দলের প্রত্যেক ব্যক্তি মৃত্যুদন্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অন্যূন এক লক্ষ টাকা অর্থদন্ডেও দন্ডনীয় হইবেন৷
(৪) যদি কোন ব্যক্তি কোন নারী বা শিশুকে-
(ক) ধর্ষণ করিয়া মৃত্যু ঘটানোর বা আহত করার চেষ্টা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদন্ডেও দন্ডনীয় হইবেন ;
(খ) ধর্ষণের চেষ্টা করেন, তাহা হইলে ব্যক্তি অনধিক দশ বত্‍‌সর কিন্তু অন্যূন পাঁচ বত্সর সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদন্ডেও দন্ডনীয় হইবেন৷
(৫) যদি পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন সময়ে নারী ধর্ষিতা হন, তাহা হইলে যাহাদের হেফাজতে থাকাকালীন উক্তরূপ ধর্ষণ সংঘটিত হইয়াছে, সেই ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণ ধর্ষিতা নারীর হেফাজতের জন্য সরাসরিভাবে দায়ী ছিলেন, তিনি বা তাহারা প্রত্যেকে, ভিন্নরূপ প্রমাণিত না হইলে, হেফাজতের ব্যর্থতার জন্য, অনধিক দশ বত্সর কিন্তু অন্যূন পাঁচ বত্সরের সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অন্যূন দশ হাজার টাকা অর্থদন্ডেও দন্ডনীয় হইবেন৷
এছাড়া উল্লেখ্য যে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন- ২০০০ এর ৩২ ধারা মতে ধর্ষিতা নারী ও শিশুর মেডিকেল পরীক্ষা ধর্ষণ সংঘটিত হবার পর যত শীঘ্র সম্ভব সম্পন্ন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক এতে অবহেলা করলে আদালত চিকিৎসকের বিরুদ্ধেও শাস্তির বিধান রেখেছেন।
তথ্যসূত্রঃ তথ্যসূত্রঃ বাংলাদেশ দন্ড বিধি , জাতীয় ই-তথ্যকোষ
আমরা সবাই ধর্ষন নিয়ে কঠিন শাস্তির কথা বলছি। আমরা চাই ধর্ষনের জন্য আরো কঠিন শাস্তির বিধান করা হোক, যেমন একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদন্ড যদিও প্রচলিত আইনে মোটামুটি কঠোর একটি আইনের বিধান রয়েছে। কিন্তু সচেতনতার অভাবে সেই আইনটি প্রয়োগ হয় না। আপাতত ভাবে আপনার আমার সামাজিক দায়িত্ব হলো, এই আইন এর প্রয়োগের জন্য জন সচেতনতা সৃষ্টি করা।
পরিশেষে, আমি বলতে চাই আমাদের জীবন যাপন এবং আমাদের ব্যক্তি স্বাধীনতার মাপ কাঠি হওয়া উচিত আমাদের সামাজিক সংস্কৃতি, আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি ধারক ও বাহক। আমরা চাই না কেউ তার ব্যক্তি স্বাধীনতার বা ব্যক্তি অধিকারের অপব্যবহার করুক। আমরা চাই না আমাদের দেশের আর কোন মেয়ে ধর্ষনের শিকার হোক। আমরা চাই না আমাদের দেশের কোন নারী মাথা নিচু করে চলুক। রাস্তায় আতংক নিয়ে চলুক। আমরা চাই নারী পুরুষের সহ অবস্থান এবং তা প্রচলিত সুষ্ঠ ধারার ভিত্তিতে।