‘অর্থপাচারের ৮০ ভাগই ব্যাংকের মাধ্যমে’

0
69

অনলাইন ডেস্ক : বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চার কৌশলে অর্থপাচারের ঘটনা ঘটছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে অর্থপাচার। তবে এই পাচারের প্রায় ৮০ ভাগই হচ্ছে ব্যাংকের মাধ্যমে। অনেক ব্যাংক কর্মকর্তাও এর সঙ্গে জড়িত।
মঙ্গলবার রাজধানীর মিরপুরে বিআইবিএম অডিটোরিয়ামে ‘ট্রেড সার্ভিসেস অপারেশনস অব ব্যাংকস’ শীর্ষক বার্ষিক পর্যালোচনা কর্মশালায় উপস্থাপিত গবেষণা প্রতিবেদনে এই কথা বলা হয়েছে। কর্মশালাটিতে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের চট্টগ্রাম অফিস থেকে অংশগ্রহণ করেন নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ হুমায়ূন কবিরসহ চট্টগ্রামের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা।
কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এবং বিআইবিএম নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান। আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. বরকত-এ-খোদা, পূবালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক হেলাল আহমদ চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক এবং বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ইয়াছিন আলি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক মূল্যায়ন এবং অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা অধিদপ্তরের কমিশনার ড. মঈনুল খান এবং এইচএসবিসি ব্যাংকের গ্লোবাল ট্রেড অ্যান্ড রিসিভেবলস ফাইন্যান্সের কান্ট্রি হেড মোহাম্মদ শহিদুজ্জামান। কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী।
কর্মশালায় গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিআইবিএমের অধ্যাপক এবং পরিচালক (ট্রেনিং) ড. শাহ মো. আহসান হাবীবের নেতৃত্বে আট সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল।
ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ট্রেড সার্ভিসের ওপর নির্ভরশীল। প্রত্যেকটি দেশে ট্রেড সার্ভিসের ক্ষেত্রে আলাদা রেগুলেশন রয়েছে। এক্ষেত্রে আমরাও নতুন গাইডলাইন করতে যাচ্ছি। তিনি বলেন, বর্তমানে ব্যবসাভিত্তিক অর্থপাচার বাড়ছে। তবে অর্থপাচার প্রতিরোধে কাজ করছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফইউ)। গত বছর থেকে ব্যাংকের সব কর্মকর্তাকে মানি লন্ডারিং বিষয়ে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। এসময় এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খোলার ক্ষেত্রে আমদানিকারকদের সবকিছু যাচাই-বাছাই করতে ব্যাংক কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব পণ্য আমদানিতে কম শুল্ক দিতে হয়, বিশেষ করে মূলধনী যন্ত্রাংশ, শিল্পের কাচাঁমাল এবং খুচরা যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে বেশি মূল্য দেখিয়ে অর্থপাচার করা হয়। আবার সরকারি প্রণোদনা পেতে রপ্তানি পণ্যে বেশি মূল্য দেখানো হয়। বৈদেশিক বাণিজ্যের পাওনা পরিশোধে অসামঞ্জস্যতা প্রমাণ করছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং শুল্ক বিভাগের যৌথ উদ্যোগে অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম অর্থপাচার প্রতিরোধে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
বিআইবিএমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বাংলাদেশের জন্য এ মুহূর্তে ইউএন কনভেনশন গ্রহণ করা প্রয়োজন। এছাড়া অর্থপাচার ঠেকাতে এলসি ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোরারোপ করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. বরকত-এ-খোদা বলেন, অর্থপাচার বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেও অর্থপাচার ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না। বাংলাদেশকেও অর্থপাচারের বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে অর্থপাচার কমিয়ে আনতে হবে। তিনি বলেন, টাকা পাচার ঠেকাতে আইন-কানুন এবং বিধির কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু অভাব শুধুই সততা। এ কারণে বড় অঙ্কের অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে।
এনবিআরের (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) কাস্টমস ভ্যালুশন অ্যান্ড ইন্টারনাল অডিট কমিশনারেটের কমিশনার ড. মঈনুল খান বলেন, অর্থপাচারের ৮০ শতাংশই ট্রেডের মাধ্যমে হচ্ছে। বর্তমানে এটা প্রতিরোধ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। বাণিজ্যভিত্তিক অর্থ পাচার বন্ধ করতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি বলেন, অর্থপাচার বন্ধে এলসি খোলার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, অর্থপাচারের ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্মকর্তারা জড়িত হয়ে পড়ে। ব্যাংকগুলোকে অর্থ পাচারের কৌশল তদারকি করতে হবে। এক্ষেত্রে কাস্টমসের সঙ্গে ব্যাংকগুলোর সমন্বয় দরকার। ৬৩৪টি পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে কাস্টমস। এই এসআরও ব্যাংকগুলো সংগ্রহ করতে পার। তাহলে এলসি করার ক্ষেত্রে সুবিধা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ইয়াছিন আলী বলেন, এটি খুবই আশঙ্কার বিষয় যে, ৮০ শতাংশ অর্থপাচারই ব্যাংকের মাধ্যমে হয়। শুধু অর্থপাচারের ক্ষেত্রে নয়, রাষ্ট্রয়াত্ত্ব ব্যাংকগুলো সমস্যায় আছে। এই সমস্যা সমাধানে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি বলেন, ঋণের সুদহার কমানোর কথা বলা হচ্ছে। ঋণের সুদহার কমালে আমানতের সুদহারও কমবে। তবে আমানতের সুদহার কখনো মূল্যস্ফীতির নিচে নামানো যাবে না। সম্প্রতি ব্যাংক মালিকরা নানান দাবি দাওয়া আদায়ের ইস্যু তুলে তিনি বলেন, ব্যাংক মালিকরা নানা ইস্যু নিয়ে সরকারের কাছে যায়। কিন্তু, খেলাপি ঋণ আদায়ের ব্যাপারে তাদের উদ্যোগ কী? খেলাপি ঋণ আদায়ে এবং মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে তারা কি সরকারের কাছে সাহায্য চেয়েছে?
এইচএসবিসি ব্যাংকের কান্ট্রি হেড অব গ্লোবাল ট্রেড অ্যান্ড রিসিভ্যাবলস ফিন্যান্স মোহাম্মদ শহিদুজ্জামান বলেন, অর্থপাচার রোধে প্রথমেই ব্যাংককেই ভূমিকা পালন করতে হবে। ব্যাংক তার দায়িত্ব পালন করলেই অর্থপাচার কমে আসবে।
কর্মসলার প্র্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, আর্ন্তজাতিক বাণিজ্যের অর্থায়নে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের আধিপত্য বেশি। ২০১১ সালে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে রপ্তানি হয় ৭১ শতাংশ। সেই সময় রাষ্ট্রায়াত্ত্ব বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে হয়েছিল ১৮ শতাংশ। অবশিষ্ট বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ২০১৭ সালে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে রপ্তানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ শতাংশ। রাষ্ট্রায়াত্ত্ব ব্যাংকের কমে দাঁড়িয়েছে পাঁচ শতাংশে।